শবেবরাতের শৈশব

শবে বরাতের বাজার-সদাই করে ছেলেটা হাট থেকে বাবার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে ফিরতে থাকবে। ওয়াপদা বেড়িবাঁধ থেকে পুবমূখী ইটের রাস্তায় নেমে রামবাবুর পুকুরটা বাঁ হাতে রেখে সাহাবাড়ির পুকুর পাড়টায় পৌঁছালে আদাব শুনে দাঁড়িয়ে পড়তে হবে। সাহাবাড়ির চারপাশে বাঁশের ঘেরা দেয়া। এই বাড়িটা কয়েক গ্রামের মধ্যে সবথেকে সাজানো বলে পরিচিত। সাহাবাড়ির পুকুরপাড়ে থাকবে কাঁচামিঠে আমগাছ আর তুলসীর বেদী। (হায়, একদিন তারা জীবনের টানে মানচিত্রের সীমা পার হয়ে যাবে!)। রাস্তার বাঁয়ে সাহাবাড়ি, ডানপাশে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়বে বিরাট মহা-বিরাট এক শিমুল গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে হাজার হাজার বাঁদুড়। পা দিয়ে ডাল আঁকড়ে ধরে উল্টো করে তাকিয়ে আছে ভূমির দিকে। ছেলেটার মনে হবে এর থেকে আরামের জীবন বোধহয় আর কিছুই নেই।

সুপুরিবাগান ছাড়িয়ে রাস্তা থেকেও তাদের গায়ের গন্ধ পাওয়া যাবে। বহু বহুকাল পরে ছেলেটার ভুতের ভয় ছাড়িয়ে দেবে এই বাঁদুড়গুলো। সুপুরিবাগানের পুবপাশেই নান্টুদের বাড়ি। সেই নান্টু যে ভোরবেলা বকুল ফুলের মালা আর ডিম কিনতে যাবে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে। তার পুবপাশে সেই ধাইবাড়ির পুকুর যেখানে গর্জনকারী কুকুর থাকবে। ঠিক এখানেই ছুটকির মা’র সাথে দেখা হবে। তার আদাবেই বাবা থমকে দাঁড়াবেন। ছুটকির মা’র কোনোদিন নিজস্ব কোনো নাম থাকবে না। তার ছুকটি নামের মেয়েটির সাপেক্ষেই তার পরিচয়। ঠিক যেমন, আঙ্গুরবালা, তোমার পরিচয় হবে তোমার কন্যা নয়নজুলি বা খনার পরিচয়ে। ছুটকির মা অন্যের বাড়িতে কাজ করবে; স্থায়ীভাবে নয়, যখন যে বাড়িতে ডাকবে তখন সেটুকুর জন্যেই। হয়তো পুরোদিন কাজ করার পর দু’বেলা খেতে দেবে আর দেবে দশটা টাকা।

সেই গ্রামে ছুটকির মায়ের মতো অনেকেরই এমন পরিচয়ই থাকবে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। শুধুমাত্র মরে গেলে জানাজার দোয়া পড়ার সময় কেউ একজন তার নাম খুঁজবে। যেমন ফারুকের বাপ। গ্রামের উত্তর দিকে ওবেরডাঙ্গির ভিটেয় যাবার পথে একেবারে প্রান্তে ফারুকের বাপের ভিটে। ভিটের উত্তর কোনায় একটা খয়ে বাবলা গাছ। বিরাট তার আকার। সেই গাছে হবে গ্রামের সবথেকে মিষ্টি খইফল। পাকা পাকা খইফলগুলো যখন ফেটে ভেতরের গোলাপি রঙের শাঁস বেরিয়ে আসবে, তখন চ্যাংড়া-চিংড়ি মিলে সবাই বাঁশের ডগার মাথায় গুণচিহ্নের মতো কঞ্চি বেঁধে একটা কোটা বানিয়ে নিবে। ফারুকের বাপ খেঁজুর রস নামিয়ে, রস জ্বাল দিয়ে, দুপুরে খেয়ে ঘুমোলে সবাই হামলা করবে ওই গাছটার উপর। হঠাৎ পায়ের নিচে পড়ে একটা ডাল ভাঙলে বা শুকনো আমপাতার কড়মড় শব্দে ফারুকের বাপের ঘুম ভেঙে যাবে। সে চিৎকার করে উঠবে : “এই, কোন শাউমাই’র ছুয়াল রে! বা(ই)রোগুনোনের জন্যিতি এট্টু কাইৎ অওয়াও গ্যালো না। ও ফা’রো, দুদ্যাক দিকিনি! ধ’রে আনদিনি নিব্বুংশেগুলোরে!”

নিজের ছেলে ফারুকের সে নাম ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারবে না। ফারুক শব্দটার মাঝে ‘ই’ যুক্ত করে বলবে ফা’রো। পেশায় সে দিনমজুর। একদিন কাজ করে পাবে দু’বেলা খাবার আর পঁচিশ টাকা। পঁচিশের আগে সে পনেরো টাকা পাবে। পনেরো টাকায় আড়াই সেরের মতো চাল হবে। পঁচিশ টাকাতেও তাই-ই হবে। তাই আকালের সময় খাবার জন্য পাকা খেঁজুরের শাঁস আর চাল বা গম ভেজে গুঁড়ো করে মিশিয়ে তাই ছাতু তৈরি করে রাখবে তার বউ, ফারুকের মা। তবু সে একদিন বাজার থেকে একটা কাঁঠাল কিনে আনবে। দুপুরে ভাত খাবার আগে সেই কাঁঠাল ভাঙবে। সস্তায় কেনা সেই কাঁঠালের শাঁস দেখে সে বলে উঠবে, “ও ফা’রো, কাঠালের দেহি ষষ্ঠি হইচ্ছে না, খালি আঁঠি হইচ্ছে”। কোনো এক চ্যাংড়া পথে যেতে যেতে সেই কথা শুনে রাষ্ট্র করে দেবে আর সকলে মিলে ফারুকের বাপকে দেখলেই সমস্বরে বলে উঠবে, “ও ফা’রো, কাঠালের দেহি ষষ্ঠি হইচ্ছে না, খালি আঁঠি হইচ্ছে”। তাতে ক্ষেপে গিয়ে সে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা শুকনো ডাল বা ধইঞ্চের কাণ্ড নিয়ে তাড়া দিবে, “শাউমাই’র ছুয়াল, বাইরো ঝুতপালা!” তখন ছেলেমেয়েরা দৌঁড়ে কোনো একটা বাড়ি বা বাগানে ঢুকে পড়বে।

ছুটকির মা ছেলেটার বাবার কাছে জিজ্ঞেস করবে, “ও উস্তাদজি, রুটির চান ওঠপে কবে?” তাতে ছেলেটির বাবা একটু বিরক্ত হয়ে বলবে, “বিষ্যইদবার”। শব-ই-বরাত-এর বদলে রুটির চান বলায় তিনি স্বভাবতই একটু বিরক্ত হবেন। তাঁর কাছে ধর্মীয় উৎসবগুলোর এক ধরনের পবিত্রতা আছে। তিনি উচ্চারণগুলো পুরোপুরি শুদ্ধ চাইবেন না বটে, কিন্তু অতোটা বিকৃতও চাইবেন না। ছেলেটা পরবর্তীতে এই ‘রুটির চান’ শব্দটার মধ্যেই গ্রাম্য প্রাকৃত ভাষার শক্তি খুঁজে পাবে। সে কথা থাক। পবিত্রতার নিদর্শন হিশেবে তিনি উৎসব পার্বনে প্রায়শই বাড়িতে উটকো অতিথি নিয়ে হাজির হন। বোরোভূয়ে (বারো ভূইয়া) বা শুকদাঁড়া গ্রামের ডাকাত আকরামকে ধরতে আসা পাঁচ পুলিশ গভীর রাতে হানা দিবে। আকরামকে না পেয়ে ফিরতি পথে খুব সকালে বসে থাকবে সুরখালী বাজারে। কখন পাইকগাছার লঞ্চটা আসবে আর তাতে করে তারা ফিরে যাবে বটিয়াঘাটা থানায়। ছেলেটার বাবা যখন বাজারে যাবেন তখন তারা দুঃখের কথা বলবে, “এই শব্বরাইত্যা রাইতে এট্টু নামাজ পরমু, রুডি-হালুয়া খামু; হ্যা না, বইয়া রইছি হাডের মদ্যে বেঞ্চের উপ্রে!” এই কথা শুনে পুরো ট্রুপ নিয়ে ছেলেটার বাবা বাড়িতে হাজির হবেন। কিংবা এক শবে বরাতে দাওয়াত দিয়ে আনবেন নতুন হতে যাওয়া গোডাউনের শ্রমিক আর কনট্রাকটরদের।

শবে বরাতের আগের দিনেই তোড়জোড় পড়ে যাবে। হাট থেকে সদাইপাতি তো এলো। কিন্তু মাংসের জোগাড় হবে কী করে? গ্রামে কিন্তু সাধারণত গরু-ছাগল জবাই হবে না। কোনো একদিন যদি জবাই হয় তাহলে ছেলেটার বাবা সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরে মায়ের সাথে আলাপ করবেন, ‘আকরামগো গরুডা জবাই দেবে। এক ভাগ কি আমরা লমু?” মা জিজ্ঞেস করবেন, “গরু কেমন?” উত্তর আসবে, “ভালো, তয় এট্টু বয়স হইছে।” মায়ের মতামত শোনা যাবে, “দ্যাহেন, যেডা ভালো মনে হরেন, হেইডা করেন।” এই হলো গরুর মাংস খাবার সুযোগ। তাই বলে মাংসের যোগান হবে না, এমন নয়। ছেলেটার মা মুরগি পুষবে। সেই মুরগির বাচ্চা যখন বড়ো হবে তখনই হিসাব থাকবে, কয়টা মোরগ আর কয়টা মুরগি রাখা হবে। চারটে মোরগ অতিথিদের জন্য, দুটো শবে বরাতের জন্য, তিনটে বিভিন্ন সময়ে নিজেরা খাবার জন্য ইত্যাদি। কম পড়লে ছেলেটাকে বলা হবে, “ওই বাড়ি তোর ভাবিরে ক’ একটা ডেগি মুরগি দিতে। আমাগো মুরগি বড়ো হইলে দিমুআনে।” এটা হলো গ্রামীণ স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থব্যবস্থা যা পরবর্তীতে ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাবে।

ফজরের আজান দেয়ার সাথে সাথে তোড়জোড় শুরু হবে। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চালের গুঁড়ো করা থাকবে আগে থেকেই। রাতে সেটা মাখিয়ে খামি করে রাখা হবে। সেই অন্ধকার ভোরে শুরু হবে রুটি বানানো। সঙ্গে চালের একটু মোটা দানার হালুয়া। আর ছোট করে কাটা মুরগির মাংসের ঝোল। সকাল হতেই একজন একজন করে আসতে শুরু করবে মানুষ। ছেলেটা তাদেরকে ভিখিরি নামে চিনবে। কিন্তু বড়ো হয়ে আর ভিখিরি বলবে না, কেননা সে নিজেই ভিক্ষা করাটাকে জীবিকা হিশেবে নিয়ে নিবে। রাষ্ট্রটাই যে ভিক্ষা করে চলতে চায়, সেটাও সে তখন জেনে যাবে। আগে থেকেই তার বাবা কতোগুলো টাকা বিশ্বকাকার দোকান থেকে ভাঙিয়ে সিকি-আধুলি করে আনবেন। সেগুলো ছেলেটার হাতে দেয়া হবে। এক একজন মানুষ এলে ছেলেটা তিনটে রুটির মধ্যে একটু সেমাই আর একটু হালুয়া পুরে তার হাতে দিবে। আর দিবে দুটো সিকি বা একটা আধুলি। তখন কিন্তু এক টাকায় এক সের চামা চিংড়ি পাওয়া যাবে।

সক্কালবেলা রুটি, হালুয়া আর সেমাই খেয়ে ছেলেটা তিনটে গামলা নিয়ে দুপুর অবধি বারান্দায় বসে বসে এভাবেই রুটি আর হালুয়া বিলাবে। আর খাতায় লিখে রাখবে কতোজন এলো আর তাদেরকে কতো টাকা দেয়া হলো। দুপুর হয়ে গেলে স্নান সেরে সে বাবা-মায়ের সঙ্গে খেতে বসবে শবে-বরাতের খাবার। তারপর পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বেরোবে গ্রামের অন্যান্য বাড়ি বেড়াতে। কয়েকজন বন্ধুও জুটবে তার। তারা সবাই মিলে বিভিন্ন বাড়ি যাবে আর খাবে ঝোল খিচুড়ি, হালুয়া, রুটি, সেমাই আর কেউ কেউ তাদেরকেও চার আনা বা আট আনা করে দিবে।

এভাবেই সন্ধ্যে হয়ে আসবে। তারপর বেড়াতে আসবে স্কুলের শিক্ষক আজিজ স্যার, নীহার স্যার, বিজয় স্যার; বাজারের দোকানদার বিশ্বকাকা, বিষ্ণুকাকা; পাড়ার আজমল কাকা, আকরাম কাকা আরো কতোজন! হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে। পুজোতেও ছেলেটার মা এমনি করে পাশের বৈরাগী বাড়ি যাবেন সন্ধ্যার পর। ছেলেটার মা সব অতিথিদের আলাদা আলাদা করে খেতে দিবেন। শিক্ষকদের জন্য একটু চাও করা হবে। ওই অজ-পাড়াগাঁয়ে ছেলেটার বাড়ি ছাড়া আর কোথাও চা খাওয়ার চল থাকবে না কিন্তু!

রাত গভীর হয়ে আসবে। অন্ধকার ঘনিয়ে এলে পরে একদিন সবাই ভুলে যাবে বাংলায় উৎসব মানে উৎসব, ধর্ম সেখানে উপলক্ষমাত্র। আর ছেলেটার শুধু কান্না পাবে।

ছেলেটা একদিন ‍পুরো গ্রামের চিত্র আঁকার চেষ্টা করবে অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটরে। কিন্তু এত বড়ো ক্যানভাস চিত্রে ধরতে না পেরে সেই চেষ্টা বাদ দিবে আর ফাইলটা মুছে ফেলবে নিজের অক্ষমতার কথা ভেবে। তবু তার এই কথা জানিয়ে রাখার জন্য আছো শুধু তুমি, আঙ্গুরবালা!